দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ দেখা যাচ্ছে এক নতুন বাস্তবতা। আগের যেকোনো আসরের তুলনায় এবার সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ফুটবলার এমন দেশের হয়ে খেলছেন, যেখানে তাদের জন্ম হয়নি। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মোট খেলোয়াড়দের প্রায় এক-চতুর্থাংশই জন্মভূমির বাইরে অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
১৩ জুন ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করা ম্যাচে ইতিহাস গড়ে মরক্কো। ম্যাচের এক পর্যায়ে মাঠে থাকা মরক্কোর কোনো খেলোয়াড়ই দেশটিতে জন্মগ্রহণ করেননি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ঘটনা নজিরবিহীন।
এবারের আসরে ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ইব্রাহিম এমবায়ে সেনেগালের হয়ে খেলতে নেমে নিজের জন্মদেশ ফ্রান্সের বিপক্ষেই গোল করেছেন। এর আগে ২০২২ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনে জন্ম নেওয়া সুইজারল্যান্ডের স্ট্রাইকার ব্রিল এমবোলো নিজের জন্মভূমির বিপক্ষে গোল করে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে আলোচনায় আসেন।
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮ দলের মধ্যে মাত্র আটটি দলে বিদেশে জন্ম নেওয়া কোনো খেলোয়াড় নেই। অন্যদিকে অভিষিক্ত কুরাসাওয়ের ২৬ সদস্যের দলে কেবল একজন খেলোয়াড়ের জন্ম সেই দ্বীপে। কাতারের দলেও রয়েছে ১০টি ভিন্ন জাতীয় পটভূমির ফুটবলার।
উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছেন ফ্রান্স জাতীয় দলের উইঙ্গার মাইকেল অলিসে। লন্ডনে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার মায়ের জন্মভূমি ফ্রান্সকে বেছে নিয়েছেন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলছেন অ্যান্টনি রবিনসন, যার জন্ম ইংল্যান্ডে।
এই প্রবণতার কারণে একই পরিবারের সদস্যদেরও ভিন্ন দেশের হয়ে খেলতে দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্স ও আইভরি কোস্টের হয়ে খেলছেন দুই ভাই ডিজিরে ও গ্যুয়েলা দুয়ে। স্পেন ও ঘানার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন নিকো ও ইনিয়াকি উইলিয়ামস। অতীতে জার্মানি ও ঘানার হয়ে বিশ্বকাপে খেলেছিলেন সৎভাই জেরোম ও কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেং।
নেদারল্যান্ডসের ইরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন ও পরিচয়বিষয়ক গবেষক গিজবার্ট অঙ্কের মতে, এই পরিবর্তন আধুনিক বিশ্বের অভিবাসন বাস্তবতার প্রতিফলন। তার ভাষায়, বিশ্বের প্রায় চার শতাংশ মানুষ এমন দেশে বাস করেন যেখানে তাদের জন্ম হয়নি। অভিজাত ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি।
ফিফা ১৯৬২ সালে প্রথম জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্বের নিয়ম নির্ধারণ করে। পরে ২০০৪ সালে নিয়ম শিথিল করা হয়। এর ফলে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে এক দেশের হয়ে খেলেও নির্দিষ্ট শর্তে অন্য দেশের সিনিয়র দলে খেলার সুযোগ তৈরি হয়।
এই নিয়মের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি মরক্কো। ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মরক্কো বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করতে দেশটি বিশেষ উদ্যোগ নেয়। তারই ফল হিসেবে ২০২২ বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠে মরক্কো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটবলারদের জাতীয়তা বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে পারিবারিক আবেগ, পেশাগত সুযোগ, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রশ্ন জড়িত থাকে। কেউ জন্মভূমির বদলে পরিবারের শিকড়ের দেশকে বেছে নেন, আবার কেউ নিজের বেড়ে ওঠার দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন।
তবে বিষয়টি বিতর্কমুক্ত নয়। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, অতিরিক্ত বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড় থাকলে জাতীয় দলের সঙ্গে সমর্থকদের আবেগীয় সংযোগ দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে অনেকেই এটিকে বৈশ্বিক অভিবাসন ও আধুনিক সমাজের স্বাভাবিক প্রতিফলন হিসেবে দেখেন।
গবেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে জাতীয় দল আর শুধু ভৌগোলিক সীমারেখার প্রতিচ্ছবি নয়; বরং এটি অভিবাসন, ইতিহাস, পারিবারিক শিকড় ও বৈশ্বিক গতিশীলতারও প্রতিফলন।
/অ